* ডিজেল ও কেরোসিন ১১৪, পেট্রোল ১৩০ ও অকটেন ১৩৫ টাকা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল 

* দাম বাড়তে যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের

প্রকাশিত: আগস্ট ০৫, ২০২২, ১০:৫৭ রাত
আপডেট: আগস্ট ০৭, ২০২২, ১১:১০ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে তেলের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করতে ডিজেল ও কেরোসিন ১১৪ টাকা, পেট্রোল ১৩০ টাকা এবং অকটেন ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা থেকেই জ্বালানি তেলের বর্ধিত দাম কার্যকর হবে। 
প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), ইস্টার্ণ রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)-এ পরিশোধিত এবং আমদানি/ক্রয়কৃত ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য সমন্বয় করে ভোক্তা পর্যায়ে এই দাম পুনঃনির্ধারণ করা হলো। 
এর আগে শুক্রবার সকালেই আরেক দফা তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আভাস দিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এদিন সকালে রাজধানীর বারিধারায় নিজ বাসায় সাংবাদিকদের এই আভাস দেন তিনি। নসরুল হামিদ বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম ওঠা-নামার মধ্যে আছে। তাই দেশে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের চিন্তা করছে সরকার। 
গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দর বেড়ে যায়। যার সার্বিক প্রভাব পড়ে গোটা বিশ্বে। ক্রমবর্ধমান দামে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় দেশে দেশে। 

নজিরবিহীন দাম বৃদ্ধি

প্রায় শতভাগ জ্বালানি তেল আমদানি করা বাংলাদেশের পরিবহন খাতের ৯০ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৪ শতাংশ তেল নির্ভর। দেশে ব্যবহৃত তেলের ৭০ শতাংশের বেশি ডিজেল। যে চার ধরনের তেলের দাম বাড়ল, তার মধ্যে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর। তখন প্রতি লিটারে দাম ৬৫ টাকা থেকে ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছিল ৮০ টাকা। নয় মাসের মাথায় তা এক লাফে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকায় নেওয়া হল।

অকটেন আর পেট্রোলের দাম সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছিল ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল। সেই হিসাবে ছয় বছর ২ মাস পর বাড়ল এ দুই তেলের দাম। ৮৬ টাকার পেট্রোল এখন দিতে হবে ৪৪ টাকা বেশি। আর ৮৯ টাকার অকটেন ৪৬ টাকা বেড়ে হল ১৩৫ টাকা। একবারে ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির ঘটনা আর কখনও ঘটেনি।

বিদ্যুত পরিস্থিতি ও সমসাময়িক প্রসঙ্গে শুক্রবার নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন বিদ্যুত ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে সরকার তেলের দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে বলেও তখন জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। এ সময় জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলায় নানা পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। আগামী অক্টোবর নাগাদ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রসহ সহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুত কেন্দ্র উৎপাদনে আসতে পারে জানিয়ে বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। আস্তে আস্তে লোডশেডিংয়ের সময়সীমা কমিয়ে আনা হবে বলেও জানান তিনি। এসময় তিনি জানান, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়ে আছে। এখন শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। তবে মানুষের উপর চাপ যাতে না পড়ে, সেজন্য সহনীয় পর্যায়ে দাম বাড়ানো হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উর্ধ্বমুখি হওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে সরকার তেলের দামে সমন্বয় করার কথা ভাবছে বলেও জানান তিনি। সেই সাথে গ্যাসের দাম বাড়ানোরও আভাস দেন। জ্বালানির বিকল্প উৎস হিসেবে কয়লা উত্তোলন বাড়ানোর বিষয়ে সরকার বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে ৬৬ শতাংশ। পিডিবির এমন প্রস্তাবে গত মে মাসে গণশুনানির পর এখন পর্যালোচনা করছে বিইআরসি। আইনে ৯০ দিনের বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে চলতি মাসেই দাম বাড়ানোর বিষয়ে আদেশ ঘোষণার কথা। আবার গত জুনে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় গড়ে ২৩ শতাংশ। যে কারণে দুই মাস আগে আবাসিক দুই চুলার গ্যাসের দাম ছিল ৯৭৫ টাকা, এখন মাসে গুণতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০ টাকা। তারপরও গ্যাসের দাম আবারও বাড়াতে চায় জ্বালানি বিভাগ। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় গত নভেম্বরের পর দেশের বাজারে আবারও সমন্বয়ের ইঙ্গিত প্রতিমন্ত্রীর। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দামের সমন্বয়ের ব্যাপারে অপেক্ষায় আছি। গ্যাসের ব্যাপারে আরেকটা সমন্বয়ে যেতে চাচ্ছি। এছাড়া তেলেরও একটা সমন্বয় হওয়া দরকার বলে মনে করছি। আর চলমান জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতিতে রাজধানীতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেকটা সহনীয় থাকলেও ঢাকার বাইরে লোডশেডিংয়ে সইতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী মাসে উন্নতি হতে পারে পরিস্থিতির। তবে গত দুই সপ্তাহে কতটা সাশ্রয় হলো জ্বালানির? সে তথ্য পর্যালোচনা করতে আরও এক মাস সময় চাইলেন নসরুল হামিদ। নসরুল হামিদ বলেন, আমাদের কাছে গত মাসের বিল আসছে। কী পরিমাণ পার্থক্য হলো, সেটা আর এক মাস গেলে বুঝতে পারব। আবারও গ্যাস-বিদ্যুৎ আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে জনজীবনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় বিকল্প ভাবার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, একটা ত্রিমুখী দাম বাড়ানোর মুখে পড়তে যাচ্ছে জনগণ। ২ মাস আগে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। তেলের দাম বড়ানো হয়েছে ৬ মাস আগে। এখন আবার বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস ও তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এতে জনগণ অনেক ভোগান্তিতে পড়বে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞ মহলের। 
জরুরি সেবা বাদে সব প্রতিষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যেই বন্ধ : জরুরি সেবায় নিয়োজিত বাদে বাকি সব প্রতিষ্ঠান রাত ৮ টার মধ্যেই বন্ধ করতে হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, অফিস ও স্কুল কলেজের সময় পরির্তনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি গাড়ি যত্রতত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, এটি কমিয়ে আনার কাজ চলছে। পরে জ্বালানি তেল প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে, বিপিসি এরই মধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এ ছাড়া শিল্পকারখানা, ব্যক্তি পর্যায়সহ সব জায়গায় গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে কাতারসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে গ্যাস আনা যায় কিনা তা দেখা হচ্ছে। 

প্রসঙ্গত, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত তেলের মূল্য সমন্বয় করে থাকে। ভারত গত ২২ মে কলকাতায় ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটার ৯২.৭৬ রুপি এবং পেট্রোল লিটার প্রতি ১০৬.০৩ রুপি নির্ধারণ করেছে যা অদ্যাবধি বিদ্যমান। এই মূল্য বাংলাদেশি টাকায় যথাক্রমে ১১৪.০৯ টাকা এবং ১৩০.৪২ টাকা। (১ রুপি = গড় ১.২৩ টাকা)। অর্থাৎ বাংলাদেশে কলকাতার তুলনায় ডিজেলের মূল্য লিটার প্রতি ৩৪.০৯ এবং পেট্রোল লিটার প্রতি ৪৪.৪২ টাকা কমে বিক্রয় হচ্ছিল। মূল্য কম থাকায় তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ পেট্টোলিয়াম কর্পোরেশন বিগত ছয় মাসে ( ফেব্রুয়ারি ২২ থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত) জ্বালানি তেল বিক্রয়ে (সকল পণ্য) ৮০১৪.৫১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। বর্তমানে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার পরিস্থিতির কারণে বিপিসির আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাতে যৌক্তিক মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়