মূল্যস্ফীতির দুষ্টচক্রে দিশেহারা ভোক্তা

প্রকাশিত: নভেম্বর ২০, ২০২২, ০৯:৫৫ রাত
আপডেট: নভেম্বর ২০, ২০২২, ০৯:৫৫ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

দেশে মূল্যস্ফীতি যেভাবে বেড়েছে সেভাবে বেতন বাড়েনি কিন্তু ব্যয় বেড়েছে কমবেশি সকল পণ্যের। গত কয়েক মাসে বাজারে কোনো সুখবর নেই। মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে বৈশ্বিক পণ্যবাজারে দামের উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে দেশের বাজারে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও পড়েছে প্রতিটি শিল্প ও সেবা খাতে । এতে কয়েক দফা বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। দুর্ভিক্ষের খবরের পর আবারও দফায় দফায় পণ্যের দাম বাড়ছে, যা এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।

দেশে মূল্যস্ফীতি গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মানুষের আয় কমেছে কিন্তু ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। এদিকে অনেক নিত্যপণ্যের দাম নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর মধ্যে দুর্ভিক্ষ ও বৈশ্বিক মন্দার শঙ্কা খোদ সরকারপ্রধানের মুখে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে খাদ্য সংকটে পড়া দেশের তালিকায়ও রয়েছে বাংলাদেশ, যা বাড়তি চাপ তৈরি করেছে সব শ্রেণির মানুষের ওপর। এর মধ্যে দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের দামও বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। সব মিলে অতিষ্ঠ জনজীবন। মানুষ সঞ্চয় ভেঙ্গে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে বাধ্য হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছে। সঞ্চয় করার কথা নিম্ন আয়ের মানুষেরা ভুলতে বসেছে।

 

এর মধ্যে দুর্ভিক্ষের খবরের পর থেকে সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম হবার উপক্রম। বিশ্বজুড়ে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি কবে থামবে তাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। অনেকে সংসার চালাতে নতুন করে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এদিকে মূল্যস্ফীতির হার গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্ষয় ক্ষমতাকে হ্রাস করেছে এবং সবখানে মানুষের প্রকৃত আয় কমে দিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের ভোগান্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নয়, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও চাপে আছেন।

পরিস্থিতি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে যে যার মতো ব্যয় সমন্বয় করে মানিয়ে চলার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন খাতে নিজেদের খরচ কাটছাঁট করছেন। কেউ দামি খাবার খাওয়া কমিয়েছেন, কেউবা বন্ধ রেখেছেন পোশাক কেনা। আবার কেউ বাসা পাল্টিয়ে খরচ সাশ্রয় করছেন।  দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ‘চিড়েচ্যাপ্টা’ ব্যাচেলররা।

বিগত কয়েক মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) ছাড়া আরও কিছু খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংস্থা বলছে, ২০২৩ সালে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে পারে অনেক দেশ। বৈশ্বিক এ মন্দার কবলে পড়লে বিশ্বের ৩৫ কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়বে। এসব সংস্থার খাদ্য সংকটের তালিকায় নাম আছে বাংলাদেশেরও।

দেশে মূল্যস্ফীতি যেভাবে বেড়েছে সেভাবে বেতন বাড়েনি কিন্তু ব্যয় বেড়েছে কমবেশি সকল পণ্যের। গত কয়েক মাসে বাজারে কোনো সুখবর নেই। মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে বৈশ্বিক পণ্যবাজারে দামের উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে দেশের বাজারে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও পড়েছে প্রতিটি শিল্প ও সেবা খাতে । এতে কয়েক দফা বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। দুর্ভিক্ষের খবরের পর আবারও দফায় দফায় পণ্যের দাম বাড়ছে, যা এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, বিগত এক বছরের ব্যবধানে বাজারে আটার দাম ৭৯ শতাংশ বেড়েছে। মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৮ শতাংশ। একইভাবে ময়দার দাম বছর ব্যবধানে ৬৪.৭৭ শতাংশ এবং মাসের ব্যবধানে ১৬ শতাংশ বেড়েছে। চালের দাম বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রধান দুটি খাদ্যশস্যের দাম বাড়ায় দারুণ চাপে পড়েছে মাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের বাজারে দুটি পণ্যের দামই দাঁড়িয়েছে ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগে মানুষ চালের দাম বাড়লে বিকল্প হিসেবে আটা-ময়দা বেছে নিতো।

এবছর সে সুযোগও নেই। আটার দামও অত্যন্ত চড়া। এমনকি চালের দামকে ছাড়িয়ে গেছে আটা-ময়দার দাম। অন্যদিকে টিসিবির তথ্যানুসারে, বাজারে সয়াবিন তেলের দাম এখন গত বছরের তুলনায় সাড়ে ২১ শতাংশ বেশি। আর চিনির দাম বেড়েছে সাড়ে ৪৫ শতাংশ। চিনির ক্ষেত্রে গত একমাসেই দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত বছর এক কেজি চিনির দাম ৮০ টাকার মধ্যে থাকলেও সেটি এখন ১১৫ টাকা। চাল-নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা মানুষ।

বিগত এক বছরে মসুর ডালের দাম ২৬ শতাংশ, অ্যাংকর ডালের দাম ৪৭ শতাংশ, রসুনের দাম ৫০ শতাংশ, শুকনা মরিচের দাম ১১৫ শতাংশ, আদার দাম ১৩০ শতাংশ, গুঁড়ো দুধের দাম ৩৭ শতাংশ, লবণের দাম ১৫ শতাংশ, ফার্মের ডিমের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট থেকে শুরু করে ডলারের সংকট হয়েছে সেটা সত্য। তবে সেসব কারণ দেখিয়ে যে হারে পণ্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে সেটা অনেক বেশি।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাজারের এ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি হুট করেই তৈরি হয়নি। করোনা পরিস্থিতির পর থেকেই আস্তে আস্তে হচ্ছে, কিন্তু সেটা সরকার আমলে নেয়নি, যা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’ 
আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। কিন্তু তেল, চিনি, ডাল ও আটা-ময়দার কোনো বিকল্প নেই। সেজন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ যেসব পণ্য আমদানি হয়, সেসব পণ্যের সরবরাহ যেন আর্থিক সঙ্কটের কারণে ব্যাহত না হয় সে লক্ষে কার্যকরী ব্যবস্থা দরকার। প্রয়োজনে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে আমদানী চ্যানেল সচল রাখতে হবে। যে সব আমদানী কারকদের ডলার সংকট রয়েছে, তাদের সাধ্যমতো সাপোর্ট দিতে হবে।

যেন তারা সুবিধামতো পণ্য আমদানি করতে পারে। তাহলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে। মুলত বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যসহ অনেক পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, দেশের বাজারে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা, পরিবহন খরচ ও বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে বাজারে। পাশাপাশি একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছেন। দুর্ভিক্ষের খবর পুঁজি করে তারা পণ্য মজুত ও অযাচিতভাবে দাম বাড়াচ্ছে। বাজারে পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে বিকল্প আমদানির উৎস খোঁজার চেষ্টা, খাদ্যে ভর্তুকি বাড়ানো ও দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর পরিসর বাড়ানো দরকার।

এখাতের দুর্নীতি রোধ করা জরুরি। অনেকে বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূখি ধারা শুধুমাত্র ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ও কোভিডের কারণ হিসেবে বিবেচনা করলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অনিয়ম, গণপরিবহনে চাঁদাবাজী, মজুদদারের দৌরাত্ম্য, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও অর্থপাচার অনেকাংশে দায়ী। ডলার সঙ্কটের কারণে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে না পারার কারণে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে অনেকটা বাধ্য হচ্ছে। এদিকে ডলার সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক বৈদেশিক বাণিজ্যের দায় পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সঙ্কটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের রপ্তানিমুখি শিল্প গার্মেন্টস খাত। জ্বালানি তেলের সংকট ও বিদ্যুতের অভাবে ক্ষেত্র বিশেষে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ। এখাতের অর্ডার কমেছে ৭ শতাংশ। রপ্তানিমুখি শিল্পখাতে জ্বালানি খরচ বেড়ে়ছে ১৬৬ শতাংশ। হুমকিতে পড়ে়ছে প্রায় ৪ কোটি মানুষের জীবিকা। জ্বালানি সংকটের কারণে গার্মেন্টস খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়ে়ছে। ইউরোপে মূল্যস্ফীতির কারণে অর্ডার কমে যাওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের পোশাক শিল্প।

ফলে চলতি বছর পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নাও হতে পারে। বেশি দামে গ্যাস বা বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করার জন্য ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হলেও তা সরকারের পক্ষ থেকে ডলার সংকটের কারণে পূরণ করা সম্ভব হয় নাই। জেনারেটর দিয়ে উৎপাদনমুখী কারখানা চালানোর ফলে জ্বালানী খরচ বেড়ে গেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে চলে গেছে। আমাদের শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তৈরি পোশাক উৎপাদন কমে যেতে শুরু করেছে। যেসব আন্তর্জাতিক পোশাক কোম্পানি আমাদের পোশাক কিনতো তারা অর্ডার দিতে বিলম্ব করছেন। ফলে  চলতি অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি খাত থেকে ৬৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করা হয়েছে তা অর্জন নাও হতে পারে।

এদিকে জ্বালানি বা গ্যাস সংকটের কারণে ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেলে বা চালানো সম্ভব না হলে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। ফলে একদিকে যেমন বহুমানুষ কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বে অন্যদিকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ বাধাগ্রস্থ হবে। সংকট সমাধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ করতে হবে। শতভাগ রপ্তানিমুখি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক সংকট সমাধানে কৃষির ওপর সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। কৃষি জমির অপরিকল্পিত ব্যবহার কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সংকট মোকাবেলায় অপ্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে হবে।

লেখক: ড. মোহাঃ হাছানাত আলী
প্রফেসর, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়