অভিবাদন সারাহ ইসলাম

প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৩, ২০২৩, ০৫:৪০ বিকাল
আপডেট: জানুয়ারী ২৩, ২০২৩, ০৫:৪০ বিকাল
আমাদেরকে ফলো করুন

অসুস্থতার দিনগুলো অবিরাম ছবি আঁকা, বন্ধুদের সংকটে ছুটে যাওয়া, শিশু  ও নারীর অধিকার নিয়ে নানা সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ আর জীবনের শেষ দিনগুলো হাসপাতালের শয্যায় শুধু শুয়ে না থেকে পাশের রোগীদের সেবাযত্নে নিজের ২০ বছরের  জীবনকে অপূর্ব মহিমায় ভরে গেছেন সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য। স্বপ্ন ছিল একজন বড়মাপের কার্টুনিস্ট হওয়ার। অমোঘ মৃত্যু তার সব স্বপ্ন-বাসনায় যতিচিহ্ন টেনে ছিল।

ঐশ্বর্য দেশের প্রথম মরণোত্তর অঙ্গদানকারী। গত বুধবার শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের পর তার দুটি কিডনি ও চোখের দুটি কর্ণিয়ায় দান করে গেছেন। এরই মধ্যে সেগুলো অন্য চারজনের দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। মাত্র ১০ মাস বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধি টিউবেরাস সেক্লোরোসিস রোগে আক্রান্ত হন ঐশ্বর্য। দু:সহ দিনগুলো পাড়ি দিয়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিয় বিষয় ফাইন আর্টসে পড়ছিলেন।

ঐশ্বর্য্যরে মা শিক্ষিকা শবনম সুলতানা বলেন, মাঝে মধ্যে মা মেয়ে দু:খের কথা শেয়ার করতাম। তখন ও বলত মা বিজ্ঞানী আইনস্টাইলও কিন্তু তার ব্রেনটা গবেষণাগারে দিয়ে গেছেন। তার ব্রেন নিয়ে এখনো গবেষণা হয়, চর্চা হয়। আমার ব্রেনও তুমি দিয়ে দিয়ো। আমার শরীরে যা কিছু আছে তুমি গবেষণাগারের কাজে দিয়ে দিয়ো। ওর এসব কথায় ভীষণ কষ্ট পেতাম। তিনি বলেন, এখন মনে হচ্ছে আমার ঐশ্বর্য জন্মেছিলেন আত্মত্যাগের জন্য। ওকে যখন শেষ গোসল করানো হচ্ছিল, ঝরঝর করে ঝরছিল রক্ত। আমি হাত দিয়ে স্পর্শ করেছিলাম।

এত কিছুর পরও মনে হয়েছে, আমার মেয়ের মুখটা তৃপ্তির হাসিতে ভরেছিল। মনে হয়নি নিথর দেহটায় প্রাণ নেই। মনে হচ্ছিল ওর শরীরের অঙ্গ দান করতে পেরে ভীষণ খুশি ঐশ্বর্য। নিজের জীবন দিয়ে সে চারটি জীবনকে বাঁচাতে পারল। সারাহ ইসলামের কিডনিতে ভালো আছেন শামীমা আহমেদ (৩৪) এবং কর্ণিয়া প্রতিস্থাপন করা সুজন (৩০) ও ফেরদৌস রহমান (৫৬)।

‘ব্রেন ড্রেন’ এই তরুণীর অঙ্গদানে নতুন জীবনে পেয়েছেন তারা। গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত সারাহ’র দুটি কিডনির একটি বিএসএমএমইউতে শামীমার দেহে এবং অন্যটি ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনে আরেক নারীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়।

টিউমার জটিলতা নিয়ে সম্প্রতি সারাহ ইসলামকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে বুধবার সন্ধ্যায় তাকে ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করা হয়। তার বয়স হয়েছিল ২০ বছর। বিএসএমএম ইউইর শহিদ ডা. মিলটন হলে। ব্রেইন ডেথ রোগীর অঙ্গদান ও বাংলাদেশে প্রথম সফল ক্যাডাভেরিক প্রতিস্থাপন বিষয়ক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।  বিএসএমএম ইউ জানায়, দেশে প্রথম বারের মতো ব্রেন ডেথ রোগীর শরীর থেকে নেওয়া দুটি কিডনি দুজনের শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন (ক্যাডাভেরিক ট্রান্স প্ল্যান্ট) করা হয়েছে।

উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শরফুদ্দিন আহমেদ বলেন, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯ এর আলোক কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের চিকিৎসা শাস্ত্রের জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছে। ক্যাডাভেরিক প্রতিস্থাপনের প্রথম অঙ্গদাতা সারাহ ইসলামের নাম বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সারাহ দেশের চিকিৎসা জগতে এ নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে যেয়েই শুধু অমিত সাহসের পরিচয় রাখেননি, বাস্তবে তার স্বল্পায়ু জীবনটাও ছিল সাহসী ও সৃজনশীল ঘটনায় পূর্ণ। জন্মগ্রহণের মাত্র ১০ মাস পরই সারাহর টিউবেরাস স্কেলেরোসিস রোগ শনাক্ত হয়, যার কোনো চিকিৎসা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও নেই।

এ ঘটনা ব্রেন ডেথ হওয়া রোগীদের কিডনি দানে স্বজনদের উৎসাহ জোগাবে। সারাহর প্রদর্শিত পথ ধরে ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টকেও ব্যাপকতা দিতে অগ্রসর হবে। ইসলামে প্রাণ বাঁচানোর গুরুত্ব দেওয়া হলেও অনেকে ভুল বোঝেন, দান করতে চাননা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। এই মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের মানুষের এগিয়ে আসতে হবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়