অটিজম শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাঁধা

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২, ০৬:৪৫ বিকাল
আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২, ০৬:৪৫ বিকাল
আমাদেরকে ফলো করুন

করতোয়া অনলাইন সংস্করণ ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ‘ ‘Daily Karatoa''য় প্রচারিত হয়েছে স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘আমাদের স্বাস্থ্য’। উক্ত অনুষ্ঠানে  ‘অটিজম শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাঁধা’ নিয়ে আলোচনা করেন বগুড়ার শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসক- ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন ডাঃ লোকমান হোসেন। দৈনিক করতোয়ার সাপ্তাহিক আয়োজন ‘ স্বাস্থ্য কথায়’ ওই আলোচনার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

করতোয়াঃ অটিজম কি?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : অটিজম হচ্ছে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার। সাধারণত বাচ্চাদের তিন ধরনের সমস্যার সম্মিলিত প্রকাশ এই অটিজম। এগুলো হলো সামাজিক সমস্যা, যোগাযোগের সমস্যা এবং আচরণগত সমস্যা। 

করতোয়া : অটিজম হওয়ার কারণ কি?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : অটিজম হওয়ার নির্ধারিত কারণ এখনও জানা য়ায়নি, এটা নিয়ে গবেষণা চলছে। যেটুকু গবেষণা হয়েছে তার ভিত্তিতে বলা যায় অটিজম মূলত জিনগত কারণে হয়ে থাকে। এছাড়াও পরিবেশের জন্য এবং বেশি বয়সে বাচ্চা হওয়ার কারণেও শিশুর অটিজম হতে পারে। সামাজিক কারণে যে সমস্যা হয় সেগুলো হলো এই বাচ্চাগুলো চোখে চোখ রেখে তাকায়না, সামাজিক হাসি দিতে পারেনা, নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়না, জয়েন্ট এ্যাটেনশন থাকেনা, সমবয়সীদের সাথে মিশতে চায়না, কারো অনুভূতি-আবেগ বুঝতে পারেনা, নিজের অনুভূতিও বোঝাতে পারেনা এবং নিজের চাহিদাগুলো প্রকাশ করতে পারেনা। এছাড়া যোগাযোগের সমস্যা গুলো হলো- অতিরিক্ত কথা বলা, অর্থহীন কথা বলা, স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়া প্রকাশ না করা এবং আচরণগত যে সমস্যাগুলো দেখা যায় তা হলো একই কাজ বারবার করে বা একই জায়গায় বার বার ঘুরে, ফাংশনাল প্লে করতে পারেনা, শরীর বা হাত একই ভাবে ক্রমাগত ঘুরাতে থাকে, অতিরিক্ত অস্থিরতা কাজ করে , ছোটাছুটি করে, কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থাকে, কোনো জিনিসের সংস্পর্শে থাকতে চায় যেমন মেঝেতে গড়াগড়ি করে, বিছানায় লাফালাফি করে। কিছু অটিজম বাচ্চা অতিরিক্ত শব্দ করে সেই শব্দ শুনতে পছন্দ করে , আবার কিছু বাচ্চা শব্দ একেবারেই সহ্য করতে পারেনা। এই সমস্যা গুলো কোনো শিশুর মধ্যে দেখা দিলে তাকে অটিজম শিশু বলা হয়।

করতোয়াঃ অটিজম নির্ণয়ে কি সবগুলো লক্ষণ থাকা জরুরি?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুনঃ সবগুলো লক্ষণ না থাকলেও সামাজিক সমস্যা, যোগাযোগের সমস্যা এবং আচরণগত সমস্যা এই তিনটি পয়েন্টের মধ্যে থেকে কিছু পয়েন্ট অবশ্যই থাকবে। এছাড়াও শিশু বিশেষজ্ঞ, থেরাপিস্ট এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রেখে আচরণ পরীক্ষা করা হয় এবং ডায়াগনস্টিক টুল দিয়ে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় শিশুটি অটিজম কি না।

করতোয়া : কোন লিঙ্গের শিশুর অটিজম বেশি হয়?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : আন্তর্জাতিক রিসার্চের মাধ্যমে দেখা গেছে ছেলে শিশুদের অটিজম বেশি হয়। এখানে রেশিও হচ্ছে ৪ঃ১ ।

করতোয়াঃ অটিজম শিশুর চিকিৎসা কিভাবে শুরু করা হয়?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : প্রথমে শিশুটির মা’কে কিছু থেরাপি এবং মানসিক বিকাশের জন্য নির্দেশনা শিখিয়ে দেওয়া হয় যেন রোজ এই থেরাপি ও কাজ গুলো বাড়িতেই শিশুটিকে অনুশীলন করাতে পারে। এভাবে তিন মাস পর পর ফলোআপ দেওয়া হয়। 

করতোয়া : কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অটিজমের চিকিৎসা করা হয়?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : দেশে বর্তমানে ৩৫টি সরকারি মেডিকেলে শিশু বিকাশ কেন্দ্র চালু আছে। শিশু বহিঃবিভাগে খোঁজ নিলেই এব্যাপারে জানা যাবে। এছাড়াও বেসরকারিভাবে এ্যাপোলো এবং স্কয়ার হাসপাতালেও অটিজমের চিকিৎসা হয়। 

করতোয়া : বগুড়া শিশু বিকাশ কেন্দ্রে কিভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : বগুড়া শিশু বিকাশ কেন্দ্রে মাল্টি ডিসিপ্লিন টিম এ্যাপ্রোচে কাজ করা হয়। যেখানে চাইল্ড হেল্থ ফিজিশিয়ান এবং ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট এর মাধ্যমে বাচ্চাদের আচরণ ও বুদ্ধির বিকাশ, শ্রবণ শক্তির বিকাশ, শারীরিক ও অঙ্গ সঞ্চালনের বিকাশ, ভাষার বিকাশ, দৃষ্টিশক্তির বিকাশ ও পরিচালনা করা হয় এবং যেসব শিশুরা অতিরিক্ত ভয় পায় তাদের কাউন্সিলিং করে স্বাভাবিক আচরণের অভ্যাস করানো হয় এবং অভিভাবকদের শিশুর আচরণ বিকাশের জন্য  নির্দেশনা দেওয়া হয় । এছাড়াও সেরিব্রাল পলসি, মৃগী রোগ, বুদ্ধি প্রতিবন্ধি ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা করা হয়।

করতোয়া : বুদ্ধি প্রতিবন্ধি, সেরিব্রাল পলসি এবং অটিজম শিশুর পার্থক্য কি?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : অটিজম শিশুর দৈহিক বা শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক শিশুর মত হলেও ব্রেনের ফাংশন কাজ করেনা। এবং সেরিব্রাল পলসি আক্রান্ত শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। এরা জন্মের পর সাথে সাথে কাঁদেনা, কানে শুনতে পায়না, ১৮ মাস পার হয়ে গেলেও বসতে পারেনা, হাঁটতে পারেনা বা অনেক দেরিতে চলাফেরা করে, শারীরিক বিকলাঙ্গ হয়, শুনতে পারেনা ইত্যাদি সমস্যা থাকে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধি শিশুর মানসিক বয়স শারীরিক বয়সের চেয়ে কম হয়, বয়স বাড়লেও এরা শিশুর আচরণ করে যেমন, ১২ বছরের শিশুর আচরণ বা বুদ্ধি ৬ বছরের শিশুর মত হয়ে থাকে। এরা যোগাযোগ বা দৈনন্দিন কাজ ঠিকভাবে করতে পারেনা এমনকি নিজেকে পরিচালনাও করতে পারেনা। 

করতোয়াঃ শিশুর জীবনমান উন্নয়নে আমরা কি কি করতে পারি?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : শিশুর আচরণে সন্দেহ হলে শিশুকে শুরুতেই দ্রুত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে তাহলে দ্রুত উন্নতি হবে। শিশুর মা-বাবা ও আশেপাশের মানুষকে এটা মেনে নিতে হবে এবং শিশুর প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। স¦াভাবিক শিশুর সাথে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ দেওয়া হলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক শিশুর অনুকরণ বা আচরণের উন্নতি করতে সক্ষম হবে। 

করতোয়া : অটিজম শিশুরা সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারে কি?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুন : অটিজম সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায় না শুধু অবস্থার উন্নতি করা যায়। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে দ্রুত উন্নতি হয়। 

করতোয়াঃ শিশু জন্মের পর খিচুনি হওয়া অটিজমের লক্ষণ কি না?

ডাঃ আবদুল্লাহ আল মামুনঃ শুধু খিচুনি হওয়া অটিজমের লক্ষণ নয়। তবে অটিজমে আক্রান্ত হলে খিচুনি হতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে জন্ম ইতিহাসে অস্বাভাবিকতা না থাকার পরেও জন্মের কয়েক বছর পার হওয়ার পরে অটিজম দেখা দেয়।  

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়