এডেনোমায়োসিসঃ এন্ডোমেট্রিওসিসের সহোদরা

প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৪, ২০২৩, ০৩:৪০ দুপুর
আপডেট: জানুয়ারী ২৪, ২০২৩, ০৩:৪০ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

আমরা জানি, জরায়ুর একেবারে ভেতরের স্তর যেটাকে বলা হয় এন্ডোমেট্রিয়াম, ওটা বাইরে অন্য কোথাও প্রতিস্থাপিত হলে সেটাকে বলে এন্ডোমেট্রিওসিস। ঠিক একইভাবে এই এন্ডোমেট্রিয়াম জরায়ুর একটু ভেতর দিকে মাথা গলিয়ে যদি মাংসল স্তর বামায়োমেট্রিয়ামের মধ্যে ঢুকে যায়, তাকে বলা হয় এডেনোমায়োসিস। এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো এটিও হরমোন(ইস্ট্রোজেন) নির্ভরশীল রোগ। 

মায়োমেট্রিয়ামে প্রতিস্থাপিত এই এন্ডোমেট্রিওটিক টিস্যু সাধারন এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যুর মতোই প্রতি মাসে স্ফিত হয়,ভেঙ্গে যায় এবং পিরিয়ডের সময় সেডিং হয়। 

খুব বেশী কমন রোগ নয় এডেনোমায়োসিস। সাধারণতঃ প্রতি পাঁচশ’ জনে একজনের এ রোগ হয়ে থাকে।

কেন হয়?

কেন যে এন্ডোমেট্রিয়াম তার নিজের এলাকা ছেড়ে জরায়ুর অন্য এলাকায় প্রবেশ করে, এর সঠিক কারণ আসলে জানা যায়নি। তবে এটি মূলত রিপ্রোডাকটিভ এজ বা গর্ভধারণে সক্ষমকালীন সময়ের মধ্যেই হয়। সুতরাং, বোঝা যায় যে রিপ্রোডাকশানের সাথে জড়িত হরমোন বা ইস্টোজেনের প্রভাবেই এর স্ফিতী হয়ে থাকে। 

এই রোগের এর লক্ষণ : পিরিয়ডকালীন এই সেডিং বের হতে পারেনা বিধায় প্রতি মাসে পিরিয়ডকালীন প্রচুর ব্যথা হয়। ভয়ানক ব্যথা। অনেকের মনে হয় যেন পেটে ছুরি দিয়ে আঘাত করছে কেউ। ধীরে ধীরে জরায়ু ফুলে বড় হয়ে যায় এবং পিরিয়ডে রক্তক্ষরণ বেশী হয়। ক্ষেত্র বিশেষে ক্রনিক পেলভিক পেইন হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে সহবাসকালীন ব্যথাও হতে পারে। এছাড়া পায়ে বা পিঠের দিকে ক্রনিকপেইন হয় কারো কারো। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এডেনোমায়োসিসের কোন লক্ষণই প্রকাশ পায় না। 

কাদের হওয়ার সম্ভাবনা বেশী? মূলত মধ্যবয়সীদের অর্থাৎ ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে এ রোগ কমন। যদিও এর কারণ জানা যায়নি, তবে ধারণা করা হয় দীর্ঘদিন ইস্ট্রোজেনের প্রভাবের জন্য এমনটা হয়ে থাকে। সাধারণত বাচ্চা জন্মদানের পরে এ রোগ হয়। এবং বাচ্চা জন্মদানের পরে দীর্ঘ সময় জরায়ু অলস সময় পার করলে এ রোগের সম্ভাবনা বাড়ে। পূর্ববর্তীতে জরায়ুতে সিজার, টিউমার সরানো, ডিএন্ডসি বা অন্য কোন অপারেশান হলেও এডেনোমায়োসিসের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

জটিলতা কি?

এডেনোমায়োসিসে রোগীর প্রলম্বিত এবং অধিক রক্তক্ষরণ সম্বলিত পিরিয়ড হয়ে থাকে। পিরিয়ডকালীন ব্যাথায় কাতর রোগীর সাধারন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। অধিক রক্তক্ষরণে এনিমিয়া বা রক্তশূণ্যতা দেখা দিতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায় রোগী। এছাড়া অনেক সময় এডেনোমায়োসিসের কারণে রোগী সন্তান ধারণে অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে। 

কিভাবে এই রোগ নিরনয় হয়?

প্রথমে রোগীর বয়স এবং লক্ষণ দেখেই মোটামুটি ধারণা করা সম্ভব। এরপর একটা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলেই কনফার্ম হওয়া যায়। এছাড়া এমআরআই করা যেতে পারে যেটি সনোগ্রাফির চেয়ে ব্যয়বহুল কিন্তু বেশী নির্ভুল। 

চিকিৎসা কি? 

এডেনোমায়োসিস যেহেতু ইস্ট্রোজেনের উপর নির্ভরশীল রোগ, সুতরাং লক্ষণ কমানোর জন্য সাধারণত প্রোজেস্টেরন নামক হরমোন দেয়া হয়। তবে প্রকৃত চিকিৎসা যদি বলি, তাহলে জরায়ু একেবারে ফেলে দিলেই এ রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব । এছাড়া স্বাভাবিক নিয়মে মেনোপজ হলেও এ রোগ সেরে যায়। 

সবশেষে বলতে পারি, এডেনোমায়োসিস জীবন বিনাশকারী কোন রোগ নয়। কিন্তু এর কারণে উদ্ভূত তীব্র ব্যথা এবং অনিয়ন্ত্রিত রক্তস্রাব রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। সুতরাং, চল্লিশের বেশী বয়সী কোন রোগীর ফ্যামিলি কমপ্লিট হলে এডেনোমায়োসিসে না ভুগে জরায়ু ফেলে দেয়া বা হিস্টেরেক্টোমি অপারেশন করে নেয়াই উত্তম। 

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা
এমবিবিএস; বিসিএস(স্বাস্থ্য); 
এফসিপিএস(অবস্ এন্ড গাইনী)
ফিগো ফেলো(ইটালী)
গাইনী কনসালটেন্ট, 
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বগুড়া।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়