গয়না বালিকা ডাক্তার তানজিলা

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২২, ০১:০২ দুপুর
আপডেট: জুলাই ২২, ২০২২, ০১:০২ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

নিজের আলোয় ডেস্ক : হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের গয়না নারীরা এখন পছন্দ করেন। নানারকম বিডস আর মেটালের তৈরি এসব অলংকারে নিজেকে সাজাচ্ছেন তারা। সৌন্দর্য, আভিজাত্য আর ফ্যাশনের অংশ হিসেবে বড় জায়গা দখল করে আছে এগুলো। হ্যান্ডমেইড বা হাতে তৈরি গয়না নিয়ে বাংলাদেশে যে কয়জন শিল্পী কাজ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম তানজিলা অমি। পেশায় ডাক্তার হলেও এই শিল্প নিয়ে কাজ করতে তার ভালো লাগে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি-বাট্টাও আশানুরূপ। চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি এটাতে তিনি এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।  

দুই মেরুর দুই পেশা। চিকিৎসাশাস্ত্র একটি বিদ্যা। অন্যদিকে গয়না তৈরি একটি শিল্প। কীভাবে সামলান তিনি?

হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করা অমি বলেন, মেডিকেলে পড়াকালে গয়না শিল্পের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। চিকিৎসাবিদ্যার জটিল পড়ালেখার সঙ্গে গয়নার সৃজনশীলতা ব্যালেন্স করা অবশ্যই কষ্টকর ছিল। কিন্তু একটি আরেকটির বিরোধী নয়। তাই কষ্ট হলেও সমস্যা হয়নি। অনেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি নাচ, গান, অভিনয় করেন। তেমনি গয়নার নকশা তৈরি একটি কাজ। দুটো পেশাই উপভোগ করি। যখন কেউ আমার পরামর্শে সুস্থ হয় তখন মন তৃপ্ত থাকে। আবার আমার বানানো গয়নায় যখন কাউকে সুন্দর দেখি তখনও সেই একই তৃপ্তি অনুভব করি হৃদয়ে। 

অমির ব্যবসায়িক জীবনের শুরু ‘এটি ক্রাফটস’ এর মাধ্যমে। গয়নার বিভিন্ন কাঁচামাল বিক্রি করতেন ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি ক্রাফটস আমার প্রথম এফ কমার্স ভিত্তিক ব্যবসা। যেটা ছিল ক্রাফটিংয়ের যেকোনো ধরনের কাঁচামালের অনলাইন শপ। এটি একটি ক্লোজড গ্র“পভিত্তিক ব্যবসা ছিল। ২০১৬ তে প্রথম এ নিয়ে কাজ শুরু করি।’ কোন ভাবনা থেকে গয়নার কাঁচামাল নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন জানতে চাইলে অমি বলেন, ‘আমাদের দেশে তখন ক্রাফটিংয়ের তেমন কিছুই পাওয়া যেত না। খুব সস্তা পুতি, লেস, কাগজ ছাড়া। আমি চকবাজার, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন পাইকারি ব্যবসায়ী ও ডিলারদের বোঝানো শুরু করি। একসময় তারা বুঝতে পারেন হাতে তৈরি গয়না একটি জনপ্রিয় ফিল্ড তৈরি করতে পারে এ দেশে।’

‘অন্যদিকে, প্রচুর নারীরা ঘরে বসে কাটানো সময়ে ক্রাফটিংয়ের জিনিসপত্র কিনে ঘরে বসে বানানো শুরু করে। গ্র“প ভিত্তিক ব্যবসা হওয়াতে নিজেদের কাজ তারা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করতেন। একজন অন্যজন থেকে ভালো লাগলে কিনতেনও। ধীরে ধীরে তারাও বুঝতে পারলেন এই কাজটি একইসঙ্গে তাদের সহজ আয়ের পথ এবং নিজেদের শখকে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যম হতে পারে। এভাবেই এটি ক্রাফটস দিন দিন জনপ্রিয়তা লাভ করে।’

বড় আকারের ব্যবসা সামলাতে একসময় হিমশিম খেতে শুরু করেন অমি। মেডিকেলের পড়ালেখার চাপ সামলে কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। তাই বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দেন এটি ক্রাফটসের যাত্রা। ততদিনে ক্রাফটিং সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছিলেন অমি। সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েই সীমিত আকারে গয়না নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘কণ্ঠীর বাক্স’।

অমি বলেন, ‘আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল হাতে বানানো দেশীয় গয়না বলতেই যে কাঠ, কাপড়, মাটির গয়না চোখে ভাসে তার বাইরে কিছু করা। এক্সক্লুসিভ হাতে তৈরি গয়নার সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করানো।’

নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার মন্ত্রে বিশ্বাসী অমি। ব্যবসা ক্ষেত্রেও তাই। ব্যক্তিগত কারণে এক বছর তাই কাজ বন্ধ রাখেন। এরপর ২০২১ সালে আবার নতুন করে নতুন নামে ক্রেতাদের কাছে ফিরে আসেন। এবার প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘অভ্র বালিকা’। অভ্র এক ধরনের পাথর বা খনিজ। গয়না তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পাথরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন অমি। তাই প্রতিষ্ঠানের এই নামকরণ। আয় রোজগারও তার ভালো। এখন গড়ে মাসে আয় হয় কমবেশি ৪০ হাজার টাকার মতো।  
প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনকে ক্রেতারা কেমনভাবে গ্রহণ করেছে? জানতে চাওয়া হয় এই নারী উদ্যোক্তার কাছে। তিনি বলেন, ‘নাম পরিবর্তনের প্রভাব দুই ভাবেই পড়েছে বলা যায়। নিয়মিত ক্রেতাদের সঙ্গে নামের জন্য নতুন ক্রেতারাও আগ্রহ প্রকাশ করছে। আবার একইসঙ্গে অনেক পুরনো ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছে না নতুন নামের কারণে।’

হাতে তৈরি গয়নার সঙ্গে অনেকগুলো বছর জড়িত রয়েছে অমি। একসময় এসব গয়নার চাহিদা তুঙ্গে থাকলেও, বর্তমানে যেন কিছুটা ভাঁটা পড়েছে। বাজারের এ অস্থিরতার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাতে তৈরি গয়নার বাজারে একসময় তারাই বিক্রি করত যাদের সৃজনশীলতা উচ্চমানের ছিল। একইসঙ্গে তারা প্রত্যেকে কাজে দক্ষ ছিলেন। বছরের পর বছর কাজের অভিজ্ঞতার পরে তারা ব্যবসা শুরু করেছেন। তাই তাদের গয়নার নকশা ও কোয়ালিটি থেকে শুরু করে সার্ভিস সবকিছুই ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করতো। 

বর্তমানে অনেকেই অন্যের কাজ দেখেই ব্যবসায় নেমে পড়ছে। তাদের দক্ষতা, সৃজনশীলতার যথেষ্ট অভাব রয়ে যায়। তাই গ্রাহক সন্তুষ্টিও কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে এ ধরনের দেশীয় গয়নার ক্রেতাও কম। চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি অদক্ষ গয়না শিল্পী আসায় ধীরে ধীরে হাতে বানানো গয়নার গুরুত্ব কমছে বলে আমি মনে করি।’
ক্রেতাদের আসল মুক্তা বা অন্য দামী পাথর চেনার উপায়ও বলে দেন এই নারী উদ্যোক্তা। তিনি জানান, আসল মুক্তা ওজনে ভারী হয়। নিখুঁত গোলাকার হয় না। স্পর্শ করলে ঠান্ডা অনুভূত হয়। আগুনে পোড়ালে ছাই হয়ে যায়। ব্লেড দিয়ে আঁচড় দিলে গুঁড়া গুঁড়া হয়। 

অমি বলেন, ‘পাথরের ক্ষেত্রে আসল পাথর ভারী ও ঠান্ডা হবে। প্রতিটি পাথরের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা দিতে এটি আসল কিনা বোঝা যায়। এই যেমন মালাকাইটের সবুজ ও কালো দাগ, ল্যাপিস লাজুলিতে গোল্ডেন দাগ। কিন্তু ল্যাপিসের মতো একই রঙের সডোলাইটে গোল্ডেন দাগ থাকবে না সাদা ছোপ থাকবে ইত্যাদি।’

কেবল গয়না নিয়ে কাজ নয়, গয়না সম্পর্কিত একটি বইও লিখে ফেলেছেন অমি। গয়না সংক্রান্ত নানা তথ্য আর ইতিহাস নিয়ে লেখা এই বইটির নাম ‘গয়নার গপ্পো’। 
বইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গয়না ও গয়নার কাঁচামাল নিয়ে অনেক বছর কাজ করার পর দেখলাম এ সম্পর্কে নব্য ও পুরাতন দুই ধরনের ক্রাফটারদের জ্ঞানের অপ্রতুলতা রয়েছে। তারা ইচ্ছেমতো মুক্তার গ্রেডিং করছে, পাথরের নাম দিচ্ছে, ইচ্ছেমতো ইতিহাস বানাচ্ছে। ফলে ক্রেতাকে আদতে একভাবে ঠকানো হচ্ছে।

আবার অনেকে গয়না সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক কিন্তু এ সম্পর্কে বাংলায় সহজ কোনো বই নেই। তাই মনে হলো পাথর, মুক্তা নিয়ে তথ্যমূলক ছোট একটি বই লিখে ফেলি। অন্তত গুটিকয়েক মানুষের হলেও কাজে দেবে। কিন্তু ইতিহাসপ্রেমী হওয়ার কারণে বইটি লিখতে লিখতে শুধু তথ্য না, গয়নার ইতিহাসের ওপরই একটি বই হয়ে গেছে।

বর্তমানে অমি তার ব্যক্তিগত চেম্বারে জেনারেল প্রাকটিশনার হিসেবে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। ডাক্তারির পাশাপাশি গয়না শিল্প নিয়েও কাজ করতে চান। 
অমি বলেন, দেশি কাপড়ের জগতে যেমন বিদেশি ফেব্রিক ও ডিজাইন দিয়ে ফিউশন হয়ে আমাদের নতুন দেশীয় পরিচয় বহন করে এমন পোশাক বানানো হচ্ছে। একইভাবে দেশি গয়নার জগতে বিদেশি কাঁচামাল ও ডিজাইনের সঙ্গে ফিউশন করে দেশি গয়নার নতুন জগত তৈরি হবে অভ্র বালিকায় এটাই আমার স্বপ্ন।’

 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়