করোনা সংক্রমণরোধে করণীয়

প্রকাশিত: এপ্রিল ০৪, ২০২১, ০২:৫১ রাত
আপডেট: এপ্রিল ০৪, ২০২১, ০২:৫১ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

মোহাম্মদ নজাবত আলী : বিগত বছরে ৮ মার্চ আমাদের দেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। সে থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের কারণে নাজেহাল পুরোবিশ্ব। বিগত কয়েক মাস আগেও ইতালি, ফ্রান্সসহ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রতিধ্বনি শোনা যায় যা এখন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে। শুরু থেকেই সরকার করোনারোধে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে করোনা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্তমানে মৃত্যু ও সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে তা আমাদের উদ্বেগ ও আশংকার কারণ। 
বর্তমান করোনার পরিবর্তিত ধরন নিয়ে বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রগুলো মহাবিপদে পড়েছে। টিকা নেওয়ার পাশাপাশি কিভাবে মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়, করোনা প্রতিরোধ করা যায় এ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রস্তুতি চলছে। গবেষকরা বলছেন, টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চললে এ মহামারির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া অনেকটা সহজ। বর্তমান পরিবর্তিত রূপটি মানবদেহে প্রবেশ করার তিন/চার দিন পর ফুসফুস আক্রান্ত হয়। ফুসফুস আক্রান্ত হওয়ার আগে হালকা জ্বর, সর্দি, গলাব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। এসময় যদি লবণসহ উষ্ণ গরম পানি নিয়ে নিয়মিত গরগরার সাথে কুলি করা যায় তাহলে সহসা এ ভাইরাস দুর্বল হবে এবং ফুসফুস সংক্রমণ অনেকটা কমে যাবে। তবুও এ মরণব্যধি মহামারিতে কোটি কোটি  মানুষ যেমন আক্রান্ত হচ্ছে তেমনি মারাও যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ। কিন্তু মরণব্যাধি এ মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নির্দেশনাগুলো মানুষ মানছেনা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এ বিষয়গুলোর দিকে বাংলাদেশের মানুষের তেমন কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। করোনাকালে স্বাস্থ্য সচেতন সম্পর্কে আমাদের কোনো গুরুত্ব নেই। এই গুরুত্ব না থাকাটা অবশ্যই বিপজ্জনক। করোনায় যে, পরিবার বা স্বজনরা আক্রান্ত হয়েছে বা মৃত্যুবরণ করেছে শুধু তারাই অনুভব করতে পারে এ মৃত্যু কষ্ট শোক ও বেদনার। অন্যরা তা অনুধাবন করতে পারেনা। যতদিন যাচ্ছে সারা বিশ্বে করোনার ভয়াবহতা আশংকাজনকভাবে বাড়ছে। সঙ্গত কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আবারো ছুটি বাড়ানো হয়। তবে অনলাইনে ক্লাস ও অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম যথারীতি চলবে। মহামারি করোনা ভাইরাসের ফলে এক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে বিশ্ব। অতীতে বিভিন্ন মহামারির ক্ষতিকর দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিগত প্রায় ১শ বছরে বিশ্ব এত বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পতিত হয়নি। এ কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। মহামারির দ্বিতীয় ধাপে তা বাড়ছে এবং তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।  
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু আগের অবস্থানে আর নেই। কারণ সংক্রমণ ও মৃত্যু দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবারো শুরু হয়েছে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন ও লকডাউন। এমনকি কোনো কোনো দেশে জরুরি অবস্থাও জারি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, সৌদি আরব সহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। তিন কারণে আমাদের দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। সংক্রমণ বৃদ্ধির তিনটি কারণ হচ্ছে- ১। যুক্তরাজ্যের অধিক সংক্রমণশীল স্টেইনটি (পরিবর্তিত ধরন) অর্থাৎ ইউ.কে ভেরিয়েন্ট। ২। উষ্ণ আবহাওয়া। ৩। স্বাস্থ্যবিধি অগ্রাহ্য করে অবাধ চলাফেরা। এমতাবস্থায় দেশে সংক্রমণ শুরুর ১ বছর পর সংক্রমণ পরিস্থিতি নতুন মাত্রায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেলেও বেশিরভাগ মানুষের করোনা নিয়ে ভয় বা শঙ্কা নেই। কারণ অধিকাংশ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতাবোধ বলতে কিছু নেই। করোনা ভাইরাসে যুক্তরাজ্যে স্টেইন বা পরিবর্তিত ধরন সম্পর্কে বিশিষ্ট অনুজীববিজ্ঞানী ড. সমীর সাহা বলেন, ভাইরাস এখন একটু বেশিই ছড়িয়ে পড়ছে। অন্য ভেরিয়েন্ট ছিল এখন ইউকে ভেরিয়েন্ট ছড়াচ্ছে। যত ছড়াবে ভাইরাসের রূপান্তরের আশংকা তত বেশি। বাংলাদেশ ভেরিয়েন্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। অতি সম্প্রতি ১২০টি করোনা ভাইরাসে জিন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ছিল ইউকে ভেরিয়েন্ট। নতুন এ ধরনের সংক্রমণ মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা অনেক বেশি প্রায় ৭০ গুন। ভয়ের কারণ হচ্ছে, গত ৫ জানুয়ারি দেশে প্রথম যুক্তরাজ্য থেকে আসা প্রবাসীদের নমুনায় ইউকে ভেরিয়েন্ট সনাক্ত হয়।  
আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ হিসাবে পরিচিত। কিন্তু আমাদের অবিবেচনা প্রসূত কিছু কর্মকান্ড বিশেষ করে গাছ কেটে বন উজাড় করা, গ্রামে-গঞ্জে অযথা গাছ কাটা, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি শতভাগ পূরণ না হওয়া পৃথিবীর আবহাওয়ার পরিবর্তিত রূপের কারণে এখন আর ছয়টি ঋতুর ভিন্ন ভিন্ন রূপ আমাদের চোখে পড়েনা। এখন মোটামুটিভাবে শীত ও গ্রীস্ম এ দুটি ঋতুই সবার চোখে পড়ে। মার্চ থেকে আগস্ট এ ছয় মাস আবহাওয়া মূলত উষ্ণ থাকে। আমাদের আশঙ্কা ছিল গত শীতে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার তা যায়নি। শীত শেষে উষ্ণ আবহাওয়ায় সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসজনিত সংক্রমণ সাধারণত মৌসুম ভিত্তিক হয়ে থাকে। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় করোনার সংক্রমণ বেশি। করোনাভাইরাস মৌসুমে প্রবল রোগ হিসেবে থেকে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে আমাদের অবশ্যই মৌসুমভিত্তিক স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমান করোনার উর্ধ্বগতি ও মৃত্যু সচেতন মানুষকে উদ্বিগ্ন করছে। কারণ বিশ্বের যেসব দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে এসেছে, সেসব দেশ এখন দুশ্চিন্তায় আছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে। অতীতেও দেখা গেছে, এ ধরনের মহামারি কমে গিয়ে আবারো বাড়ার ইতিহাস আছে। যদি তাই হয় তাহলে বিশেষজ্ঞদের মতে অতীত মহামারির ইতিহাস বলে দ্বিতীয় ধাপটি হবে ভয়াবহ। ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেক উন্নত রাষ্ট্রে বিশেষ করে যুক্ত রাষ্ট্র, জার্মানী, ইতালি, ফ্রান্সসহ কয়েকটি রাষ্ট্রে আবারো বেড়েছে কোভিড-১৯। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্য সচেতন ও সতর্কতার ওপর জোর দিয়েছে। পরিস্থিতির মোকাবেলায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এমনকি কোনো কোনো দেশ লকডাউনও ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র একেবারেই উল্টো। বর্তমান করোনার পরিবর্তিত ধরনটি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েই যাচ্ছে তাতে সবাই সতর্ক ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে তা সামাল দেওয়া বড় কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। তাই আমাদের আরো সতর্ক ও সচেতন হওয়া দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনা প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব, নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্য সচেতন সহ যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন তা মেনে চলা। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আম জনতার মাঝে সচেতনতাবোধ এখনো তৈরি হয়নি। বেশিরভাগ মানুষই করোনা নিয়ে চিন্তিত নয় এটা তাদের চলাফেরা ও কথাবর্তায় বুঝা যায়। তারাতো মাস্ক ব্যবহার করছেইনা উল্টো দিকে মাস্ক পরে কি হবে এমন মনোবৃত্তি তাদের। তাদের এ ধরনের মনোভাব ত্যাগ করা জরুরি। 
একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া বর্তমানে সবকিছু খোলা। শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষায় ধাপে ধাপে ছুটি বাড়ানো হয়। ৩০ মার্চ পর্যন্ত ছুটি ছিল তা ঈদ পর ২৩ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয় তারপরও আমরা জানিনা পরবর্তীতে কি হবে তা আল্লাহই জানেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি নিয়ে কম সমালোচনা হচ্ছেনা। যারা সমালোচনা করেন, তাদের অবশ্যই বোঝা উচিত যে, একজন শিক্ষার্থী আক্রান্ত হলে এর দায়ভার নিবে কে? স্কুল খোলা মানেই সব দায়িত্ব সরকারের। বর্তমানে প্রায় সবকিছু শিথিল করায় মানুষ অসতর্ক ও স্বাস্থ্য সচেতন  বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করে। মানুষ হাটে বাজারে, বাইরে যেভাবে ঘোরাফিরা করছে তাতে দেশে কোভিড ১৯ নামে যে মারাত্মক ভাইরাস বিরাজমান এটা তারা মনেই করছেনা। অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করছেনা। কিন্তু করোনা এমন একটি মরণব্যাধি ভাইরাস যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। মাস্ক ব্যবহার করলে এ ভাইরাস মুখনাক দিয়ে মানব দেহে প্রবেশ করতে পারেনা। তাছাড়া আমরা স্বাস্থ্য সচেতন নই। আমাদের মাঝে যে, স্বাস্থ্য সচেতনতাবোধ কমে গেছে তা বাড়াতে হবে। একজন থেকে অন্যজনের মাঝে এ ভাইরাস বিস্তার প্রতিরোধের ব্যবস্থা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া এই বিষয়গুলোর ওপর যদি আমরা গুরুত্ব না দেই তাহলে আমরা আরো বিপদগ্রস্ত হব। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাস্ক ব্যবহার লকডাউনের চেয়েও কার্যকর। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো কে কার কথা শোনে।   
মানুষের জীবন রক্ষায় বর্তমান বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি চলছে। টিকা একটি প্রতিষেধক মাত্র। টিকা নিলেই যে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবেনা এটা সঙ্গত নয়। তাই টিকা নেয়ার পরও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। পর্যটন কেন্দ্রে উপচেপড়া মানুষের ভিড়। অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। তাছাড়া গণপরিবহন, বিয়ে বাড়ি, পিকনিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানসহ সর্বত্র মানুষের সমাগম। নেই কোনো সামাজিক দূরত্ব, মানা হচ্ছেনা স্বাস্থ্যবিধি। এসব কারণেও সংক্রমণ উর্ধ্বমূখী বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিদ আবু জামিল ফয়সল। তাই সরকারকে এসব বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ ও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। করোনা নিয়ে হেলাখেলা নয়। আমরা যেমন ব্যক্তিগত সুরক্ষায় নজর দিব তেমনি স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান করোনা সংক্রমণ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য টিকা নেওয়া যেমন জরুরি তেমনি স্বাস্থ্যবিধি মানাও। এই কঠিন দুঃসময়ে সৃষ্টিকর্তার নিকট আমাদের প্রার্থনা তিনি যেন সমগ্র মানব জাতিকে রক্ষা করেন।  
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট 
[email protected]
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়